Home / অন্যান্য / হাতুড়ি দিয়ে ভাঙা সব দাঁত‚ নখ ওপড়ানো‚ অচেতন মাস্টার দা সূর্য সেনকে টেনে হিঁচড়ে আনা হয়েছিল ফাঁসির মঞ্চে

হাতুড়ি দিয়ে ভাঙা সব দাঁত‚ নখ ওপড়ানো‚ অচেতন মাস্টার দা সূর্য সেনকে টেনে হিঁচড়ে আনা হয়েছিল ফাঁসির মঞ্চে

সান্ধ্য জলখাবার খেতে বসেছেন স্বামী | পাশে স্ত্রী | দরজায় শব্দ | পাড়ারই চেনা ছেলে | দেখা করতে এসেছে স্বামীর সঙ্গে | স্ত্রী সবে ভাবছেন সেখান থেকে সরে যাবেন কিনা‚ আচমকা পাড়ার ছেলের হাতের দায়ের কোপে স্বামীর মুণ্ডু ধরাশায়ী |

থরথর কাঁপছেন গ্রাম্য বধূ | ঘাতক যাওয়ার আগে বলে গেলেন‚ মাস্টার দার সঙ্গে বেইমানি করার এটাই উপযুক্ত শাস্তি |

ব্রিটিশ পুলিশ কতবার কতভাবে জেরা করেছে ওই সাধারণ আটপৌরে ঘরনিকে | একবার তিনি বলুন স্বামীর ঘাতকের নাম | সেই নাম ফাঁস করেননি নেত্র সেনের বিধবা |
বলেছিলেন‚ তিনি চোখের সামনে স্বামীকে লুটিয়ে পড়তে দেখে মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত | বৈধব্যের কষ্টে বিদ্ধ | কিন্তু যে মানসিক যন্ত্রণায় সবথেকে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন তা হল এই জেনে যে তাঁর স্বামী নেত্র সেন একজন প্রতারক | যিনি ব্রিটিশ পুলিশের পুরস্কারের লোভে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন মাস্টার দার মতো ব্যক্তির সঙ্গে | তাই তাঁকে হত্যা করে ঠিকই করেছেন মাস্টার দার সহযোগী ঐ তরুণ এবং তাঁকে মেরে ফেললেও তিনি ওই বিপ্লবীর নাম বলবেন না |

হয়রানির বেশি আর কিছু নেত্র সেনের স্ত্রীকে করেনি ব্রিটিশ পুলিশ | ততদিনে তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়ে গেছে | কারাগারে নির্মম অত্যাচার করা হচ্ছে মাস্টার দার উপরে |
ছাপোষা স্কুলমাস্টার ! তাঁর এতো দুঃসাহস | হানা দেয় কিনা ব্রিটিশ অস্ত্রাগারে !

বাবা রমণীরঞ্জন সেনও ছিলেন স্কুলশিক্ষক | ব্রিটিশ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির চট্টগ্রাম জেলায় সংসার | স্ত্রী শীলাবালা দেবীর কোল আলো করে এল সূর্যকুমার | ১৮৯৪-এর ২২ মার্চ | ছেলের নামকরণ যে এত সার্থক হবে ভাবতেও পারেননি রমণীরঞ্জন |

বড় হয়ে গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে ১৯১৬ সালে সূর্য গেলেন বহরম পুরে | বিএ পড়তে ভর্তি হলেন কলেজে | সেখানে এক শিক্ষক তাঁকে যেন নতুন করে পৃথিবীর আলো দেখালেন | দেশকে স্বাধীন করার জন্যই এই জীবন‚ নতুন শিক্ষায় আলোকিত হলেন সূর্যকুমার সেন |

চট্টগ্রামে ফিরে ১৯১৮ সালে নন্দনকানন ন্যাশনাল স্কুলে যোগ দিলেন সূর্য সেন | চট্টগ্রাম শাখার সভাপতিও ছিলেন | গণিতের শিক্ষক মুখে মুখে হয়ে গেলেন মাস্টার দা | যোগ দিলেন কংগ্রেসে | কিন্তু মন বলত অন্য কথা | বলত‚ অহিংস নয়‚ সহিংস পথেই আসবে স্বাধীনতা | অনুশীলন সমিতিতে যোগ দিলেন মাস্টার দা |
মাস্টার দার কথায় বহু তরুণ তরুণী যোগ দিলেন তাঁর গেরিলা বাহিনীতে | গণেশ ঘোষ‚ লোকনাথ বল‚ নরেশ রায়‚ শশাঙ্ক দত্ত‚ অর্ধেন্দু দস্তিদার‚ প্রীতিলতা ওয়েদ্দেদার‚ কল্পনা দত্ত…ছিলেন তাঁর গেরিলা বাহিনীর সদস্য |

ঠিক হল ব্রিটিশ অস্ত্রাগার লুঠ করতে হবে | সেইসঙ্গে চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে দেশের বাকি অংশ থেকে | অভিযানের জন্য বেছে নেওয়া হল ১৯৩০-এর ১৮ এপ্রিল | গুড ফ্রাইডে‚ পার্বণের মেজাজে ইউরোপিয়ানরা | ৬৫ জন বিপ্লবী দু ভাগে বিভক্ত হয়ে শুরু করলেন অভিযান |

প্রথমে রেললাইন উপড়ে‚ টেলিগ্রামের খুঁটি ভেঙে চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হল বাইরের দুনিয়া থেকে | গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা পুলিশের অস্ত্রাগার ঘিরে ফেললেন | লোকনাথ বলের নেতৃত্বে দশ জন বিপ্লবী ঘিরলেন অক্সিলিয়ারি ফোর্সেস আর্মরি |

মাস্টার দার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সর্বাত্মক সফল হয়নি | বিপ্লবীদের বলিদান ছিল‚ কিন্তু রিসোর্স তো স্বল্প | ঠিকমতো বোঝা যায়নি কোথায় রাখা আছে গোলা-বারুদ | অস্ত্র লুণ্ঠন হয়েছিল | কিন্তু গোলাবারুদের হদিশ পাওয়া যায়নি | তবে অভিযানের দিন মাস্টার দা মিলিটারি স্যালুট নিয়েছিলেন বিপ্লবীদের | উত্তোলন করেছিলেন জাতীয় পতাকা |

অভিযানের পরে সূর্য সেন ও বিপ্লবীরা আত্মগোপন করেছিলেন চট্টগ্রামের কাছে জালালাবাদ পাহাড়ে | ২২ এপ্রিল তাঁদের ঘিরে ফেলল ব্রিটিশ বাহিনী | দু পক্ষের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে মৃত্যু হল ১২ জন বিপ্লবীর |

জালালাবাদ পাহাড় থেকে ছোট ছোট দলে সূর্য সেন বিপ্লবীদের পাঠিয়ে দিলেন বিভিন্ন গ্রামে | আত্মগোপন করে থাকতে | নিজেও পালালেন মাস্টার দা | পরের কয়েক বছরে অনেকে ধরা পড়লেন | অনেকে পুলিশের গুলিতে প্রাণা হারালেন | কিছু কলকাতায় পালাতে পারলেন | কয়েকজন চেষ্টা করলেন ছাত্রভঙ্গ সংগঠন আবার জুড়তে |

মাস্টার দা বিভিন্ন ছদ্মবেশে আত্মগোপন করলেন | গোয়ালা‚ চাষি‚ পুরোহিত‚ ধর্ম প্রাণ মুসলিম‚ কী না সেজেছেন তিনি | কতবার ধরা পড়তে পড়তে একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছেন |

ব্রিটিশের সঙ্গে তাঁর লুকোচুরি শেষ হল যখন মাস্টার দা সূর্য সেন আশ্রয় নিয়েছিলেন নেত্র সেনের বাড়িতে | নেত্র সেনের কাছ থেকে খবর পেয়ে ১৯৩৩-এর ১৬ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ পুলিশ সেখান থেকে গ্রেফতার করে বিপ্লবী সূর্য সেনকে | ঘোষিত ১০ হাজার টাকা পুরস্কার পাওয়ার আগেই বিশ্বাসঘাতকতার উচিত শাস্তি পান নেত্র সেন | ঘাতকের নাম কোনওদিন পুলিশের কাছে বলেননি নেত্র সেনের স্ত্রী | তিনি ছিলেন মাস্টার দা সূর্য সেনের পরম ভক্ত |

জেল থেকে সূর্য সেনকে মুক্ত করার পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁর সহযোগী বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার | কিন্তু সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায় | পুলিশ গ্রেফতার করে পরিকল্পনাকারীদের |

১৯৩৪-এর ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলে ফাঁসি হয় মাস্টার দা সূর্য সেনের | বলা ভাল‚ তাঁর অচেতন দেহটাকে টেনে হিঁচড়ে ফাঁসি দেওয়া হয় | তার আগে বন্দি অবস্থায় সূর্য সেনের উপরে অকথ্য অত্যাচার করা হয় | হাতুড়ি মেরে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল সব দাঁত | উপড়ে নেওয়া হয়েছিল প্রত্যেকটা নখ | মেরে মেরে চুরমার করে দেওয়া হয়েছিল দেহের সব জয়েন্ট | ফাঁসির পর কোনও শেষকৃত্যও হয়নি | শোনা যায়‚ ধাতব খাঁচায় ভরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল বঙ্গোপসাগরে |
১৯৩৪-এর ১২ জানুয়ারি মাস্টার দা সূর্য সেনের সঙ্গে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল আর এক বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদারকেও | যদিও বাঙালির কাছে দিনটা এখন শুধুই স্বামী বিবেকানন্দর জন্মদিন |

Comments

comments

Check Also

যে কারণে আপনি মানুষের কাছে অবহেলিত?

সামাজিক জীবনে অহরহ আমরা অন্যের ঘৃণার শিকার হই। জীবনে চলার পথে নিজের অজান্তেই আপনি নিজের ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *